সোমবার, জুলাই ১৩, ২০২০ || ২৯ আষাঢ়, ১৪২৭ || ২২শে জিলকদ, ১৪৪১ হিজরি

রাত জাগা : ইসলাম কী বলে

আল্লাহ তায়ালা রাতকে বানিয়েছেন বিশ্রামের জন্য আর দিনকে বানিয়েছেন জীবিকা তালাশের জন্য। মহান আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন। তিনিই ভালো জনেন আমাদের জন্য কোনটি কল্যাণকর আর কোনটি অকল্যাণকর। আল্লাহ বলেন : আমি তোমাদের বিশ্রামের জন্য নিদ্রা দিয়েছি তোমাদের জন্য রাত্রিকে করেছি আবরণস্বরূপ আর দিনকে বানিয়েছি তোমাদের কাজের জন্য।’ (সূরা : নাবা আয়াত : ৯-১১) অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন : আল্লাহ তোমাদের জন্য রাত বানিয়েছেন। যাতে তোমরা তাতে বিশ্রাম করতে পারো এবং দিনকে করেছেন আলোকোজ্জ্বল। নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি বড়ই অনুগ্রহশীল। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। (সূরা গাফির : ৬১)

স্বাস্থ্যঝুঁকি : বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয় যুক্তরাজ্যের ৪ লাখ ৩৩ হাজার মানুষের ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা যায় সকালে তাড়াতাড়ি ওঠা ব্যক্তিদের চেয়ে রাতজাগা মানুষের অকাল মৃত্যুর আশঙ্কা ১০ শতাংশ বেশি। গবেষণায় দেখা যায়, দেরি করে ঘুম থেকে ওঠার কারণে বিভিন্ন মানসিক ও শারীরিক জটিলতার শিকার হতে হয়। তা ছাড়া রাত জাগার বদাভ্যাস যারা গড়ে তুলেছেন তাদের ৯০ শতাংশ বিভিন্ন মানসিক ব্যাধির শিকার হন। ৩০ শতাংশের থাকে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি। এছাড়া স্নায়বিক সমস্যা থেকে শুরু করে অন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায়।

আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানব আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন। আবু বারযাহ রা: থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ সা: এশার আগে ঘুম ও এশার পরে কথাবার্তা অপছন্দ করতেন। (বুখারি, হাদিস : ৫৩৭)

এ থেকে বোঝা যায়, রাসূল সা: এশার আগে ঘুম ও এশার পর কথোপকথন অকল্যাণ মনে করতেন। আজ আমাদের তরুণ সমাজ এতটাই বেপরোয়া হয়ে গেছে দুনিয়ার চাকচিক্যের মোহে পড়ে নিজেদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অশনিসঙ্কেত। রাত জেগে ফেসবুক টুইটারে আসক্তি ও শ্রুতিমধুর বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান শোনা আমাদের তরুণ প্রজন্মের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। স্বাস্থ্যগত নানা সমস্যায় তরুণ বয়সেই আক্রান্ত হচ্ছে। রাত জেগে কাজ করলে দেহঘড়ির স্বাভাবিকতায় ছন্দপতন হয়, তছনছ হয়ে যায় দেহের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া আর এর ফলে যে অপূরণীয় ক্ষতি হয় তা হয় দীর্ঘমেয়াদি।

স্মৃতিশক্তি কমে যায় : যারা কম ঘুমায় তাদের মস্তিষ্ক ঠিকভাবে কাজ করে না। কোন কাজটি আগে করতে হবে তা তারা বুঝতে পারে না। এর সাথে দেখা যায় অমনোযোগিতা। ঘুমালে চোখ ও মস্তিষ্ক কিছু সময়ের জন্য বিশ্রাম পায়। এতে স্মৃতিশক্তি ভালো থাকে। সৃজনশীল কাজে গভীরভাবে মনোনিবেশ করা সহজ হয়। যাদের ঘুমে সমস্যা তাদের স্মৃতিশক্তি ধীরে ধীরে লোপ পায়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, রাত জাগা ও অপর্যাপ্ত ঘুমানো ছাত্রদের একাডেমিক পারফরমেন্স যারা স্বাভাবিক ঘুমায় তাদের তুলনায় কম। এ কারণেই পরীক্ষার আগের রাতে অনেক রাত পর্যন্ত জেগে পড়াশোনা করা অনুচিত।

মানসিক রোগ : যারা রাতে ঠিকমতো ঘুমায় না বা রাত জেগে থাকে তাদের মধ্যে বিষণœতা, অস্থিরতা, বিরক্তি, হ্যালুসিনেশনসহ নানাবিধ মানসিক রোগের বা উপসর্গের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। আর যারা ইতোমধ্যে এসব রোগে ভুগছেন তাদের রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। এ কারণে মানসিক রোগের চিকিৎসায় ঘুমের ওষুধের প্রয়োগ বেশি দেখা যায়।

ঘুম থেকে দেরিতে ওঠার পরিণতি : রাতে দেরি করে ঘুমালে সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে যায়। এতে সারা দিনের কাজ করার উদ্যমতা নষ্ট হয়। মেজাজ খিটখিটে থাকে অনেক বেশি। এছাড়া বিভিন্ন অসুখ বিসুখ যেমন : ডায়াবেটিস, হার্টের অসুখ, কিডনির সমস্যা ইত্যাদি হতে পারে।

প্রত্যুষে ঘুম থেকে ওঠার উপকারিতা : সারা দিন সে উদ্যমের সাথে কাটাবে। আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকতপ্রাপ্ত হবে। কারণ এক হাদিসে এসেছে রাসূল সা: এ উম্মতের সকাল বেলার জন্য দোয়া করেছেন। আল্লাহ তায়ালা আমার উম্মতের জন্য সকাল বেলায় বরকত দান করুন। (আবু দাউদ) নবী করিম সা: দোয়া করেছেন আর উম্মতকে এই শিক্ষাও দিয়েছেন যে, আয় উম্মাতি যদি সাফল্য চাও, কল্যাণ তালাশ করো, তবে দিনের প্রথম অংশকে সুন্দর বানাও।

হজরত ফাতেমা বিনতে মুহাম্মদ সা: থেকে দুর্বল সনদে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূল সা: আমার ঘরে এসে আমাকে ভোরবেলায় ঘুমন্ত অবস্থায় দেখলেন, তখন আমাকে পা দিয়ে নাড়া দিলেন এবং বললেন, মামণি! ওঠো! তোমার রবের পক্ষ থেকে রিজিক গ্রহণ করো! অলসদের দলভুক্ত হয়ো না। কেননা আল্লাহ সুবহে সাদিক থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত মানুষের মধ্যে রিজিক বণ্টন করে থাকেন। (শুআবুল ঈমান, হাদিস : ৪৪০৫)

সকালে ঘুম থেকে উঠলে দেহ-মন সতেজ থাকে। এ ছাড়া কাজ করার জন্য সারা দিন প্রচুর সময় পাবেন আপনি। যারা সকালে ঘুম থেকে ওঠেন, তারাই কেবল জানেন ওর উপকারিতা। সকালে উঠলে কাজের জন্য সময় বেশি পাওয়া যায়। এ ছাড়া কাজের গতি বেড়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, যখন কোনো ব্যক্তি ভোরে ওঠেন, তখন অন্যদের তুলনায় তিনি বেশি সক্রিয় থাকেন এবং কাজে সময় নেন কম।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ভোরে ঘুম ভাঙে, তারা বেশি সুখী হন। এই সুখ স্বল্পমেয়াদি নয়, বরং সারাটা জীবন ধরেই সুখ ছুঁয়ে যায়।

লেখক : সিনিয়র শিক্ষক, জামিয়া বাবুস সালাম, বিমানবন্দর, ঢাকা

Sharing is caring!

শেয়ার করুনঃ
shares