শুক্রবার, আগস্ট ৭, ২০২০ || ২৩ শ্রাবণ, ১৪২৭ || ১৭ই জিলহজ, ১৪৪১ হিজরি

আল্লাহকে ভালবাসার আলামত


আল্লাহকে ভালবাসার দাবিদার আমরা সবাই। তাকে ভালবাসার দাবি করেন না এমন মুসলমান পাওয়া কঠিন। তবে দাবি করা যত সহজ, ভালবাসার মর্ম নিজের মাঝে ধারন করে জীবন যাপন করা তত সহজ নয়।

প্রেমের সম্পর্ক কঠিন পরীক্ষা দিয়ে ভরা। অতএব, কোনো মুসলমানের জন্য উচিত নয় আল্লাহকে ভালবাসার নামে শয়তানের ধোঁকায় পড়া। আত্মার প্রবঞ্চনায় পড়ে খালি হাতে আখেরাতে যাওয়া। এজন্য প্রয়োজন আল্লাহর প্রতি প্রকৃত ভালবাসা ও লৌকিকতার মাঝে পার্থক্য জানা।

মনে রাখতে হবে, আল্লাহর ভালবাসা একটি পবিত্র বৃক্ষ বা ঝর্নার ন্যায়। কারো হৃদয়ে তা জন্মালে কথাবার্তা ও চালচলনে তা প্রকাশ পাবে। আল্লাহর সঙ্গে ভালবাসা পরীক্ষার বহু মাধ্যম রয়েছে, একজন সাধারণ মানুষও চিন্তা করলে তা বুঝতে পারবে। তার থেকে কিছু নিম্নে আলোচনা করা হচ্ছে।

আল্লাহ তায়ালাকে দেখা ও তার সঙ্গে দ্রুত সাক্ষাতের জন্য মৃত্যুর আকাঙক্ষী হওয়া:

যখন কেউ না দেখে কারো প্রেমে পড়ে যায় তখন থেকে সর্বদা সে কামনা করে কীভাবে তার প্রেমিকের সঙ্গে সাক্ষাত করা যায়। মনের বাসনা থাকে দ্রুত তার দেখা পাওয়ার। বান্দা ও আল্লাহর ভালবাসার ক্ষেত্রেও বিষয়টা এমনই। আবার দুনিয়ায় থেকে আল্লাহকে দেখা সম্ভব নয়। তাই তখন বান্দা আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাত ও দেখা পাওয়ার আশায় দ্রুত মৃত্যুর কামনা করতে থাকে। অতএব, আল্লাহর সঙ্গে ভালবাসার মান যাচাইয়ের একটি বিষয় হচ্ছে, তার সাক্ষাতের আশায় দ্রুত মৃত্যু হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা। সূফিয়ান ছাওরি ও বিশর হাফি (রাহ.) বলতেন, সন্দেহকারীরাই মৃত্যুকে অপছন্দ করে। কেননা প্রেমিক, প্রেমিকার সঙ্গে সাক্ষাতকে কোনো অবস্থাতেই অপছন্দ করতে পারে না। হজরত বুয়াইতী (রাহ.) কিছু দরবেশকে জিজ্ঞেস করেন, তোমরা কি মৃত্যুর জন্য আকাঙক্ষী? তখন তারা কিছুক্ষণ চুপ থাকলো। তিনি তখন তাদেরকে বলেন, যদি তোমরা প্রকৃত দরবেশ হতে তাহলে মৃত্যুর জন্য আকাঙক্ষী হতে।

আল্লাহ তায়ালাও কোরআনে এ কথা বলেছেন, ‘আপনি বলুন, হে ইহুদীরা! তোমরা দাবি করো যে, তোমরা আল্লাহর বন্ধু, অন্য মানুষ নয় তবে তোমরা মৃত্যু কামনা করো যদি তোমরা সত্যবাদী হও (কারণ বন্ধু, বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে আগ্রহী থাকে। আর আমার সঙ্গে মৃত্যু ব্যতীত সাক্ষাত করা অসম্ভব। তাই স্বাভাবিক দাবি হচ্ছে, আমার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য তোমরা মৃত্যু কামনা করবে)। কিন্তু তারা কখনো একাজ করবে না, ওইসব কাজের কারণে যা তারা অগ্রিম পাঠিয়েছে।’ (সূরা: জুমা, আয়াত নম্বর: ৬-৭)।

কোনো কোনো হাদিসে মৃত্যুর আকাঙক্ষা পোষণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। ওই হাদিসের উদ্দেশ্য হচ্ছে, বিপদের কারণে মৃত্যুর আকাঙক্ষা পোষণ নিষেধ। আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের নিয়তে মৃত্যুর আকাঙক্ষা নিষেধ নয়। (বর্তমান সময়ে অনেক দরবেশ ও পীর মাশায়েখ আছেন। দ্বীনের প্রচার, মানুষের আত্মশুদ্ধি ও নীতি-নৈতিকতা শিখান। তবে মৃত্যুর আকাঙক্ষী এমন পীর দরবেশ সাধারণত পাওয়া যায় না। যত দিন জীবিত থাকেন মনে মনে অন্য বিভিন্ন আশা পোষণ করেন। তাহলে সাধারণ মুসলামান, যারা দ্বীন ধর্মের ব্যাপারে অসচেতন তাদের অবস্থা কেমন? আল্লাহর মহব্বতের দাবি করলেও প্রকৃত আল্লাহ প্রেম অনেক মুসলমানের ভেতরেই নেই। আমাদের সবাইকে প্রকৃত আল্লাহ প্রেমিক হওয়ার তাওফিক দান করুন আমিন-অনুবাদক)।

আল্লাহ তায়ালা ও তার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষয়ের আলোচনা প্রিয় হওয়া:

কোনো মানুষ কারো প্রেমে পড়ে গেলে, প্রেমিকার বিষয়ে কোনো আলোচনা শুনলেই মনে খুশি লাগে। প্রেম গভীর হলে এ খুশী লাগা শুধু প্রেমিকা সম্পর্কে আলোচনা শুনাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তাকে ছাড়িয়ে তার সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর প্রতিও ভালবাসা জন্ম নেয়। সেসব বিষয়ের আলোচনা শুনলেও মনে তখন তৃপ্তি আসে। তদ্রুপ আল্লাহর ভালবাসার ক্ষেত্রেও। কারো ভেতর আল্লাহর প্রেম জন্মালে, আল্লাহর জিকির ও তার আলোচনা শুনে মনের ভেতর এক ধরনের শান্তি অনুভূত হবে। সে ভালো লাগা এক সময় আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের দিকেও ছড়ায়। যেমন আল কোরআন হচ্ছে আল্লাহর কালাম বা বাণী। তাই আল্লাহর এ বাণী পড়া ও বুঝা দ্বারা সে প্রশান্তি পায়। প্রেমিকার দূতকে যেমন গুরুত্ব দেয়া হয়, আল্লাহর তরফ থেকে প্রেরীত নবীগদেরকে ওই রকম গুরুত্ব দেয়া হয়। এভাবে আল্লাহর প্রত্যেক বিষয় বান্দার কাছে গুরুত্ব পায়।

সুফিয়ান সাওরি (রাহ.) বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রেমিককে ভালবাসে, তার ওই ভালবাসা প্রকৃত অর্থে আল্লাহর জন্য হয়। হজরত ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, কোনো ব্যক্তি নিজের নফসের কাছে কিছু জানার থাকলে তা হচ্ছে আল কোরআন। কোরআন সম্পর্কে নিজের নফসকে প্রশ্ন করতে পারে যে, কোরআনকে সে ভালবাসে কিনা? নফস যদি কোরআনকে ভালবাসে তাহলে তার ওই ভালবাসা প্রকৃত অর্থে আল্লাহর প্রতি ভালবাসা। কোরআনের প্রতি ভালবাসা না থাকলে তার মাঝে আল্লাহর প্রতি কোনো ভালবাসাই নেই। তাই আল্লাহর প্রতি ভালবাসা মাপার আরেকটি মানদণ্ড হলো, আল্লাহর আলোচনা ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয়ের আলোচনা ভালো লাগা বা না লাগা।

(আমরা অনেকে আছি যাদের কাছে কোরআন পড়া, নবীদের আলোচনা শুনার চেয়ে গল্প করা, সিনেমা দেখা বা অলস সময় পার করা ভালো লাগে। কিন্তু একজন মুসলমানের জন্য এমনটা কখনো উচিত নয়। শয়তানের প্রবঞ্চনায় পড়ে আগে এমনটা করে থাকলেও এখন তওবা করে ফিরে আসা উচিত। কারণ, বর্তমান সময়ে মৃত্যু আমাদের যত কাছকাছি অনুভূত হয় এর আগে কখনও এমন হয়নি-অনুবাদক)

আল্লাহর প্রিয় বিষয়কে নিজের ভালো লাগা বিষয়ের ওপর প্রাধান্য দেয়া:

নিজের পছন্দ ও ভালো লাগা বিষয়ের ওপর আল্লাহর পছন্দ ও ভালো লাগাকে প্রাধান্য দেয়া। প্রকাশ্যে ও গোপনে সবখানে। আমরা জানি, আল্লাহ তায়ালার কাছে নেকির কাজ পছন্দনীয়। খায়েশাতের অনুগামী হয়ে জীবন যাপন করা অপছন্দনীয়। সুতরাং যে আল্লাহ প্রেমে পড়বে সে বেশি বেশি নেকির কাজ করবে। সর্বদা আল্লাহর অনুগত হয়ে জীবন যাপন করবে। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকবে কীভাবে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। দুনিয়ার প্রেম ভালবাসার দিকে তাকালেই আমরা বিষয়টি বুঝতে পারবো। কারো প্রতি ঝুঁক সৃষ্টি হলে, যেকোনো মূল্যে সে তার কাছে যেতে চায়। এখন প্রেমিকার মনোভাব যদি হয় সর্বত্র আমার অনুগত হয়ে চলতে হবে তাহলে প্রকৃত প্রেমিকের জন্য এটা কঠিন কোনো বিষয় নয়। সে প্রেমিকার নির্দেশনা মেনেই সর্বত্র চলবে। প্রেমিকা যে রঙ, খাবার পছন্দ করে তার কাছেও ওই রঙ, খাবার পছন্দনীয় হয়ে ওঠে।

হজরত সাহাল (রাহ.) বলেন, ‘ভালবাসার আলামত হচ্ছে, নিজের জীবনের চেয়ে প্রেমিকার চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেয়া। যারা আল্লাহর বিধানের অনুগত হয়ে জীবন যাপন করে সবাই আল্লাহর প্রিয় হতে পারে না। প্রকৃত প্রেমিক ওই লোক হতে পারে, যে আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয় পরিহার করে চলে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এজন্য ফুজাইল ইবনে আয়াজ বলতেন, আমাকে কেউ যখন জিজ্ঞেস করে, তুমি কি আল্লাহকে ভালবাসো? তখন আমি চুপ থাকি। কারণ, সরাসরি না করলে কুফুরির আশঙ্কা হয়। আর যদি বলি আল্লাহকে ভালবাসি তাহলে আমাকে বলা হবে প্রেমিকের আলামত তোমার মাঝে নেই তাহলে তুমি কেমন ভালবাসো?

আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি মহব্বত থাকা তার প্রতি ভালবাসা থাকার আলামত:

আল্লাহর বান্দাদের প্রতি ভালবাসা রাখা এবং যারা তার দুশমন তাদের প্রতি দুশমনি রাখাও আল্লাহর প্রতি মহব্বতের আলামত। আল্লাহ তায়ালা নিজের বান্দাদের পরিচয় এভাবে দিয়েছেন যে, ‘তারা পরস্পর দয়াশীল, কিন্তু আল্লাহর দুশমনদের ব্যাপারে কঠোর।’ (সূরা: ফাতহ, আয়াত: ২৯)। প্রসিদ্ধ একটি হাদিস আছে যে, সমস্ত সৃষ্টিজগত আল্লাহর পরিবারভূক্ত। আর আল্লাহর কাছে ওই লোক প্রিয় যে তার সৃষ্টির প্রতি ইহসান করে। তাই যারা সৃষ্টির প্রতি প্রেম-রহম থেকে বিরত তারা কখনো আল্লাহর মহব্বতের দাবি করতে পারে না।

আল্লাহর অনুগত হয়ে চলাকে বোঝা মনে না করা:

আল্লাহর অনুগত হয়ে চলা, নেকির কাজ করাকে গনিমত মনে করা। কখনো নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত ইত্যাদিকে বোঝা মনে না করা। এসবও আল্লাহর প্রতি ভালবাসার আলামত। মানুষ প্রেমিকাকে যতই সময় দেয় কখনো ক্লান্তি আসে না। তদ্রুপ আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী যত বেশি করা হোক কখনো ক্লান্তি এসে ভর করবে না। প্রখ্যাত বুজুর্গ ব্যক্তি ছিলেন জুনায়েদ বাগদাদি (রাহ.)। তিনি বলেন, ‘প্রেমের আলামত হচ্ছে সর্বদা সক্রিয় থাকা। প্রাণবন্ত থাকা। শরীর ক্লান্ত হবে, কিন্তু হৃদয় সজাগ থাকবে।’ মানুষে বলে, ক্লান্তি ভালবাসার খেলায় ভর করার সুযোগ পাওয়া না। দুনিয়ার সাধারণ প্রেম-ভালবাসার দিকে তাকালেও আমরা বিষয়টি বুঝতে পারবো। প্রেমিক কখনো প্রেমিকার চাহিদা, বাসনা পুরা করাকে নিজের ওপর বোঝা মনে করে না। বরং এর দ্বারা মনে তৃপ্তি আসে। যদিও কখনো কখনো শরীরের ওপর চাপ হয়ে যায়, কিন্তু মনের প্রশান্তির কারণ তার কোনো চিহ্ন শরীরে ফুটে উঠে না।

আল্লাহর স্মরণ ব্যতীত কেটে যাওয়া সময়ের জন্য আফসোস হওয়া:

আল্লাহর প্রেমের আরেকটি আলামত হচ্ছে, দুনিয়ার সব কিছু হাতছাড়া হয়ে গেলেও আফসোস হবে না, কিন্তু ওই মুহূতগুলোর জন্য আফসোস হবে, আল্লাহর স্মরণ ব্যতীত যা ব্যয় হয়েছে। আল্লাহর স্মরণ থেকে কখনো গাফেল হয়ে গেলে স্মরণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে তওবা-ইস্তেগফার করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসবে। অমূল্য সম্পদ সময় এভাবে চলে যাওয়ার দরুন নিজেকে তিরস্কার করবে। দুনিয়ার সাধারণ প্রেম ভালবাসার ক্ষেত্রেও আমরা এমনটি দেখতে পাই। মানুষ কোনো কারণে প্রেমিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেও প্রেমের দরিয়ায় যখন জোশ আসে নিজেকে সে ধরে রাখতে পারে না। সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পর অতীতে বিচ্ছেদের মুহূর্তগুলোর জন্য আফসোস হতে থাকে।

এগুলো ছাড়াও আল্লাহর মহব্বত পরীক্ষার করার আরো মাধ্যম রয়েছে। যেমন: আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হওয়ার আকাঙক্ষী হওয়া। নবী করিম (সা.) এর সময়ে কিছু মানুষ আল্লাহকে ভালবাসার দাবি করেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, এর পরীক্ষা হবে আমার রাস্তায় শহিদ হওয়ার মাধ্যমে।

Sharing is caring!

শেয়ার করুনঃ
shares