শুক্রবার, আগস্ট ৭, ২০২০ || ২৩ শ্রাবণ, ১৪২৭ || ১৭ই জিলহজ, ১৪৪১ হিজরি

এক ঋণদাতা ব্যক্তির ঘটনা, যা প্রত্যেকের জন্য হতে পারে অনুসরণযোগ্য (ঋণ থেকে মুক্তির আমল)


সমাজে এমন অনেক মানুষ আছে যারা ঋণ নেয়ার পর তা পরিশোধে অপরাগ। ঋণে পরিশোধে অপরাগ ব্যক্তিদের বাড়ি-ঘর কেড়ে নেয়ার সংবাদও শোনা যায়। আবার সামান্য ঋণের কারণে গুম-খুন-হত্যার মতো জঘন্য ঘটনাও ঘটে থাকে।

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনুল কারিমে ঋণের বিষয়ে বলেন,

مَّن ذَا الَّذِي يُقْرِضُ اللّهَ قَرْضًا حَسَنًا فَيُضَاعِفَهُ لَهُ أَضْعَافًا كَثِيرَةً وَاللّهُ يَقْبِضُ وَيَبْسُطُ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ

অর্থ: ‘এমন কে আছে যে, আল্লাহকে করজ দেবে, উত্তম করজ; অতঃপর আল্লাহ তাকে দ্বিগুণ-বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেবেন। আল্লাহই সংকোচিত করেন এবং তিনিই প্রশস্ততা দান করেন এবং তাঁরই নিকট তোমরা সবাই ফিরে যাবে।’ (সূরা: বাকারা, আয়াত: আয়াত: ২৪৫)।

কোরআনুল কারিমের এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ঋণ দেয়ার প্রতি এ মর্মে উদ্বুদ্ধ করেছেন যে, যদি কোনো ব্যক্তি কাউকে ঋণ দেয় তবে আল্লাহ তায়ালা ওই ব্যক্তিকে দ্বিগুণ-বহুগুণ (সম্পদ) বাড়িয়ে দেবেন।

বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে মহামারি করোনার কারণে অনেক মানুষ জীবন-যাপনে কষ্ট ভোগ করছেন। এরই মাঝে যারা ঋণগ্রস্ত তাদের অবস্থা আরও বেশি শোচনীয়। সুযোগ থাকলে এ মুহূর্তে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিদের সময় ও সুযোগ দেয়া জরুরি।

প্রিয়নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে তা পরিশোধে সময় সুযোগ দেয়ার জন্য নসিহত পেশ করেছেন।

হাদিসে পাকে এক ঋণদাতা ব্যক্তির ঘটনা উঠে এসেছে। যা প্রত্যেকের জন্য হতে পারে অনুসরণযোগ্য।

প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেন-

কেয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে মহান রাব্বুল আরামিন আল্লাহ তায়ালার সামনে আনা হবে। আল্লাহ তায়ালা তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, বলো, তুমি আমার জন্য কী সওয়াব অর্জন করেছ?

ওই ব্যক্তি বলবে, হে আল্লাহ! আমি একটি অণু পরিমাণ সায়াবের কাজও করতে পারিনি। যার প্রতিদান আজ আমি আপনার কাছে চাইতে পারি।

আল্লাহ তায়ালা তাকে দ্বিতীয়বার একই কথা জিজ্ঞাসা করবেন এবং সে একই উত্তর দেবে। আল্লাহ তায়ালা তাকে আবারও (তৃতীয় বার) জিজ্ঞাসা করবেন।

এবার লোকটি বলবে, হে আল্লাহ! একটি সামান্য আমলের কথা মনে পড়ছে। আপনি দয়া করে আমাকে কিছু সম্পদ দান করেছিলেন। আমি ব্যবসা করতাম। লোকেরা আমার কাছ থেকে (প্রয়োজনে) ঋণ-কর্জ নিত।

কিন্তু আমি যখন দেখতাম এই (ঋণগ্রস্ত) ব্যক্তি দরিদ্র এবং নির্ধারিত সময়ে সে কর্জ পরিশোধ করতে পারছে না তখন আমি তাকে আরও কিছুদিন অবকাশ (সময় ও সুযোগ) দিতাম। (এমনকি) ধনীদের উপরও পীড়াপীড়ি করতাম না। (অনেক সময়) অত্যন্ত দরিদ্র ব্যক্তিকে ক্ষমাও করে দিতাম। আল্লাহ আমার এই ছোট্ট আমল ছাড়া আর কোনো কিছুই মনে পড়ছে না।

তখন রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা বলবেন, ‘তুমি আমার বান্দাদের জন্য কর্জ পরিশোধ করা সহজ করে দিয়েছিলে, তাহলে আমি কেন তোমার পথ সহজ করে দেব না? আমি তো সর্বাপেক্ষা বেশি দানশীল ও দয়ালু। যাও, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। তুমি জান্নাতে চলে যাও।’ সুবহানাল্লাহ!

ঋণ পরিশোধে সময় সুযোগ দেয়ার ঘটনা নিয়ে বর্ণিত প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ হাদিসটি হাদিসের বিখ্যাত গ্রন্থ- মুসলিম, ইবনে মাজাহ ও ফাতহুল বারিতে বর্ণনা করা হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ হাদিসটি হতে পারে ঋণদাতাতের জন্য পরকালের নাজাতের উসিলা। বিনা হিসাবে জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম মাধ্যম।

আবার ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য জরুরি হলো, যথাসময়ে ঋণ পরিশোধের সর্বাত্মক চেষ্টা থাকা। আল্লাহর কাছে ঋণ থেকে মুক্ত হতে প্রার্থনা করা। যেভাবে প্রার্থনা করতে শিখিয়েছেন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আর তাহলো-

اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلاَلِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكِ عَمَّنْ سِوَاكَ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাকফিনী বিহালালিকা আন হারামিকা ওয়া আগনিনী বিফাদ্বলিকা আম্মান সিওয়াক।

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আপনার হালালের সাহায্যে হারাম থেকে বাঁচান। আর আপনার অনুগ্রহ দ্বারা আপনি ব্যতিত অন্যের মুখাপেক্ষিতা থেকেও বাঁচান।’ (তিরমিজি, মিশকাত)

যদি কারো পাহাড় পরিমাণ দেনার চাপও থাকে, আল্লাহ তায়ালা এ দোয়ার উসিলায় তা পরিশোধ করার সামর্থ্য দান করে বলেও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিন্তাযুক্ত অবস্থায় এই দোয়া পড়তেন,

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَ أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَ أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَ أَعُوذُ بِكَ مِن ضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযানি, ওয়া আউজুবিকা মিনাল আঝযি ওয়ালকাসালি, ওয়া আউজুবিকা মিনালবুখলি ওয়ালজুবনি, ওয়া আউজুবিকা মিন দ্বালায়িদ্দাইনি ওয়া গালাবাতির রিজাল।’

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অপারগতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে, ঋণের ভার ও মানুষদের দমন-পীড়ন থেকে।’ (বুখারি, মুসলিম ও মিশকাত)।

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহর সব ঋণদাতাকে এ হাদিসের ওপর যথাযথ আমল করার তাওফিক দান করুন।

পবিত্র কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনায় জীবন গঠন করে দুনিয়া ও পরকালে আলোকিত জীবন লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।

Sharing is caring!

শেয়ার করুনঃ
shares