শুক্রবার, আগস্ট ৭, ২০২০ || ২৩ শ্রাবণ, ১৪২৭ || ১৭ই জিলহজ, ১৪৪১ হিজরি

হজ হোক মুসলিম উম্মাহর বিশ্ব ঐক্যের প্লাটফর্ম


হজ ইসলামের পঞ্চভিত্তির অন্যতম একটি ভিত্তি। প্রথম ফরজগুলোর একটি। হাদিস শরিফে এসেছে-

عن عبد الله بن عمر بن الخطاب رضي الله عنهما قال : سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول : بني الإسلام على خمس : شهادة أن لا إله إلا الله ، وأن محمدا رسول الله ، وإقام الصلاة ، وإيتاء الزكاة ، وحج البيت ، وصوم رمضان  

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাযি.) থেকে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ইসলামের বুনিয়াদ পাঁচটি জিনিসের ওপর। এক আল্লাহর ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওপর ঈমান আনা, দুই নামাজ কায়েম করা, তিন জাকাত আদায় করা, চার বাইতুল্লাহর হজ করা, পাঁচ রমজানের রোজা রাখা। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)।

মুসলমানদের স্বতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য। ঐক্যের মহামিছিল। ভ্রাতৃত্বের বিশাল আয়োজন। প্রভুপ্রেমের ভারী দৃষ্টান্ত। অর্থ ব্যয়ের অদ্বিতীয় কোরবানি। ইব্রাহিমী আর্দশের প্রতিচ্ছবি। হজ শব্দের শাব্দিক অর্থ ইচ্ছা, বাসনা, সংকল্প ইত্যাদি। পরিভাষায় হজ বলা হয়- নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট স্থানের জিয়ারত করাকে। হজ সব মুসমানের ওপর ফরজ না। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,

وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا 

‘মানুষের মধ্যে (ঈমানদারদের মধ্যে) যারা কাবা ঘরে পৌঁছতে সক্ষমতা রাখে সে যেন হজ আদায় করে। (সূরা: আলে ইমরান, আয়াত: ৯৬)।

ফুকাহায়ে কেরামরা বলেন, যে ব্যক্তি আকলমান প্রাপ্ত বয়ষ্ক, সুস্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিজনের খরচের পর হজের সব খরচের ওপর সক্ষম, সে ব্যক্তির ওপর কেবল হজ ফরজ। হজের গুরুত্ব দিয়ে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

عن أبى هريرة قال خطبنا رسول الله -صلى الله عليه وسلم- فقال ্র أيها الناس قد فرض الله عليكم الحج فحجوا

হজরত আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- হে মানবজাতি! আল্লাহ তোমাদের ওপর হজ ফরজ করেছেন, সুতরাং তোমরা হজ আদায় করো। (সহিহ মুসলিম: হাদিস নম্বর ৩৩২১)।  অন্য এক হাদিসে,

عن عبد الله بن مسعود قال : قال رسول الله صلى الله عليه و سلم تابعوا بين الحج والعمرة فإنهما ينفيان الفقر والذنوب كما ينفي الكثير خبث الحديد والذهب والفضة وليس للحجة المبرورة ثواب إلا في الجنة

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযি.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তোমরা হজ এবং ওমরাহ করতে থাকো, কেননা হজ এবং ওমরাহ দরিদ্রতা আর পাপকে দূরিভূত করে দেয়; যেমনিভাবে কামার (এর হাতুড়ে) লোহা সোনা রুপার ময়লা দূরিভূত করে দেয়। একটি মকবুল হজের বিনিময় জান্নাত ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না (তিরমিজি : হাদিস নম্বর ৮১০)। আরো কঠোর ভাষায় যে ব্যক্তির হজের ওপর সামর্থ থাকা সত্তেও হজ করলো না, সে নাসারা হয়ে মরুক ইহুদি হয়ে মরুক আমার কোনো দেখার বিষয় না। (মুসলিম) এরূপভাবে হজ সম্পর্কে আরো বহু হাদিস রয়েছে।

হজ আমাদের ঐক্যের মাইল ফলক:

হজ ঐক্যের আহ্বান। ভ্রাতৃত্বের স্লোগান হৃদ্যতা আর সৌহার্দ্যের সুরভিত প্রাণ। বোধ শৃঙ্খালার অনুভূতি বর্ণবৈষম্য আর গোত্র ভেদাভেদের গায়ে কুঠার আঘাত করে প্রভু প্রেমের পথকেই উন্মুক্ত করে। কাবা নির্মাণের পর আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর বৈপ্লবিক ঘোষণার পর হতে আজ তক শতো সহজ্র বছরেও হজের স্বাদ জৌলুশ একটুও কমেনি, বরং দিনের পর দিন হজের শান শওকত বাড়ছে। সীমানা বাড়ছে। সৌহার্দ্য স্বাদ সব বাড়ছে। দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত হতে এসে মক্কার পবিত্র নগরিতে দাঁড়িয়ে সবাই যখন সম্মিলিত সুরে ‘লাবাইক আল্লাহুম্মা লাবাইক লা শারিকা লাবাইক’ এর আওয়াজ বুলন্দ করে, তখন আবেগে কেঁদে ফেলে মুসলমানের হৃদয় আত্মা। ইব্রাহিমী স্মৃতি স্মারকের পাতা উল্টিয়ে হাজির যখন সাফা মারওয়ার চক্করে মিলিত হয়, তখন মনে হয় এটা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম শৃঙ্খলাবোধ।
নিয়মানুবার্তিতা। ঐক্যের মহা স্লোগানে ভ্রাতৃত্বের সুরে সুরে লাব্বাইকের সুরতরঙ্গে দোলে উঠে প্রত্যেক হাজির মনবন্দর। সারা দুনিয়ার শুভ্র-কৃষ্ণ, ধনী-নির্ধন, মুকিম-মুসাফির, মুনিব- গোলাম, বাদশা-নওকর হাতে হাত রেখে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রভুর শান মান বর্ণনা করে। আহ! কতো অপৃর্ব দৃশ্য। সবাই যেন জনম জনমের পরিচিত। চিরচেনা আত্মীয়। সর্বোপরি সব শ্রেণির মুসলমান নিজেদের অহমিক অহঙ্কার বিলিয়ে দিয়ে সাম্যের পরিচ্ছদে আবৃত হয়। এর থেকে বুঝা যায়, উঁচু নিচু অসমতার পাহাড় দলিয়ে মথিয়ে সমতার প্রাচীর গড়া হজের মৌলিক কর্মসূচি। সবার ভাবের আদান প্রদানে একে অপরের আত্মীয় বনে যায়।

আজ এদিনে আমাদের মাঝে ঐক্যের বড়ো অভাব, পরপর ভাব, সম্প্রীতির খড়া, সহমর্মিতার অনুপস্থিতি। তাই দুনিয়ার প্রান্তে প্রান্তে অপমানিত লাঞ্ছিত বিরত জাতি হিসেবে আমরা পরিচিত। দিনে দিনে আমরা নিচু আর উচ্ছন্ন হয়ে পড়ছি। মার খাওয়া জাতি বলতে পৃথিবীবাসী আমাদেরকেই চিনে। আজ আমাদের এ জনপদে রক্ত ঝরছে তো কাল ওই জনপদে। আজ এখানে জ্বলছে তো কাল ওইখানে জ্বলছে। খবরের বিশাল পেইজে আমাদের রক্তাক্ত ছবি। ইজ্জতহারা বোনের ছবি। মায়ের হাহাকারের ছবি। এভাবে হয়েতো আমরা একদিন বিলীন হয়ে যাবো। পৃথিবীর ক্ষমতাধরেরা আমাদের লাল কার্ড দেখিয়ে বিদায় করে দেবে। পৃথিবীর বুকে থাকবে না আমাদের পরিচিতি পরিচয়। আজকে বিশ্বমানচিত্রে এক নিগৃহিত জাতির নাম মুসলমান। মুসলমান এমন কপালপোড়া যে, তারা নিজেরাও জানে না সে যে দুর্ভোগে চরমে কষ্টে আছে। সেই আজ নিজেকে আর মুসলমান বলে পরিচয় দিতে চায় না। নিজের পিতৃপরিচয় ভুলে অমুসলিমদের মতো হয়ে গেছে।

ব্যথিত হৃদয়ে বলছি ১৪৪১ হিজরির হজ হয়ে উঠুক আমাদের ঐক্য আর মিল-বন্ধনের মাইল ফলক। ভ্রাতৃত্বের সীসাঢালা প্রাচীর। একজন মুমিনের আক্রান্তে কেঁপে উঠুক পুরো মুসলিম সত্তা। প্রতিবাদ প্রতিরোধ আর প্রতিশোধের নেশায় ঝাঁপিয়ে পড়ুক রক্তান্ত মুসলিম জনপদে। আর যেন একটি শিশুও বোমা বৃষ্টিতে না ভিজে এ আশায়।

Sharing is caring!

শেয়ার করুনঃ
shares