শুক্রবার, আগস্ট ৭, ২০২০ || ২৩ শ্রাবণ, ১৪২৭ || ১৭ই জিলহজ, ১৪৪১ হিজরি

হজ সংক্রান্ত জরুরি মাসআলা

হজের বাসনা কার না থাকে। তবে সঠিক নিয়ম মেনে ও হালাল উপায়ে এ পথের যাত্রী হতে হবে। না হলে সব কিছুই বৃথা।

জেনে নিন হজ সংক্রান্ত ৮টি জরুরি মাসআলা-

(১) উমরার ইহরাম বাঁধার পর উমরা না করেই হজ করার বিধান!

প্রশ্ন: এক ব্যক্তি উমরা করার জন্য ইহরাম বাঁধল। তারপর অসুস্থ্যতাবোধ করায় উমরা না করে, উক্ত ইহরামেই হজ সম্পন্ন করার নিয়ত করল। এ ব্যাপারে হুকুম কী?

উত্তর: উমরার ইহরাম দিয়ে হজ আদায় করা সুন্নতের খেলাফ। মাকরূহ হবে। সেই সঙ্গে পরবর্তীতে এ উমরার কাযাও আদায় করতে হবে। যদিও উমরার ইহরাম দিয়ে হজ আদায় করলে হজ আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু তার ওপর একটি ‘দম’ তথা কমপক্ষে এক বছর বয়স্ক বকরি কোরবানি দিতে হবে। (ফাতাওয়া কাসিমীয়া-১২/১৯৬-১৯৭)।

(২) কোম্পানির মালিকের টাকায় হজ আদায়। 

প্রশ্ন: কেউ একজন প্রাইভেট কোম্পানিতে জব করে। তার কোম্পানির মালিক প্রতি বছর ১ জন করে কোম্পানি থেকে লটারির মাধ্যমে বাছাই করে হজে পাঠায়। হজের সব খরচ মালিক বহন করে। এখন প্রশ্ন হলো, ১. এই টাকা দিয়ে হজ করলে কোম্পানির কর্মকর্তার ফরজ হজ আদায় হবে কিনা? ২. কোম্পানির কর্মকর্তার নিজস্ব সম্পত্তি/টাকা থাকা সত্ত্বেও কোম্পানির টাকা দিয়ে হজ করলে ফরজ হজ কবুল হবে কিনা এবং এতে করে কোম্পানির মালিক সওয়াবের কমতি হবে কিনা? ৩. কোম্পানির অনেক কর্মকর্তা থাকায় লটারির মাধ্যমে ১ জনকে বাছাই করার পদ্ধতি ঠিক হবে কিনা ? ৪. হজ করানো কারণে কোম্পানির মালিকে কী ফায়দা হবে ? ৫. হজ করানোর কারণে কোম্পানির মালিকের নিয়ত করলে কী কোম্পানির কর্মকর্তার হজ সুন্দর হবে। ৬. অথবা উভয় পক্ষের জন্য সহিহ তরিকা কী হতে পারে।

উত্তর: কোম্পানির মালিক যদি এভাবে হজ করানো দ্বারা বদলি হজ করানোর ইচ্ছে না করে থাকে, বরং অন্যকে হজ করানোই উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এভাবে যিনি হজ করতে যাচ্ছেন, তার ওপর ফরজ হওয়া হজ আদায় হয়ে যাবে। বাকি টাকাটি কোম্পারির মালিক হাদিয়া দেয়ায় উপরোক্ত হজের সওয়াবও তিনি পাবেন। যদিও হজ আদায়কারীর সওয়াবে কোনো কমতি হবে না। আর উপরোক্ত পদ্ধতিতে লটারীর মাধ্যমে একজন কর্মকর্তাকে নির্ধারিত করার মাঝেও শরয়ী কোনো বিধিনিষেধ নেই। যিনি লটারীতে হজের জন্য নির্বাচিত হবেন, তিনি নিজের হজেরই নিয়ত করবেন। যদিও মালিকের টাকায় হজ করার কারণে সওয়াব মালিকও পাবে। দোয়া কবুলের স্থানসমূহে অর্থদাতা মালিকের জন্য কল্যাণী দোয়া করবে।

আর অর্থদাতা অফিসের মালিক, টাকা হাদিয়া দেবার সময় মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি পাবার আশায়ই উক্ত হাদিয়া প্রদান করবে। ইনশাআল্লাহ তার আমলনামায়ও কবুল হজের সওয়াব লিপিবদ্ধ হবে। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের পথ দেখায় সে উক্ত কাজ সম্পাদনকারীর ন্যায় সওয়াব পায়।’ (সহীহ মুসলিম, হাদিস- ১৮৯৩)।

(৩) ছবি তোলা হারাম! তাই বলে কী হজ থেকে বিরত থাকা যাবে?

প্রশ্ন: হজ করা ফরজ। কিন্তু ছবি তোলা হারাম। হজ করতে গেলে ছবি লাগবে। ছবি তোলা হারাম। এখন কী করা?

উত্তর: অহেতুক প্রাণীর ছবি আঁকা ও তোলা উভয়ই হারাম। এতে কোনো সন্দেহ নেই। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে তা দিবালোকের ন্যায় পরিষ্কার।

কিন্তু পবিত্র কোরআন নির্ধারিত একটি মূলনীতি হলো, তীব্র প্রয়োজন হারামকে সাময়িক হালাল করে দেয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘যেগুলোকে তোমাদের জন্যে হারাম করেছেন; কিন্তু সেগুলোও তোমাদের জন্যে হালাল, যখন তোমরা নিরূপায় হয়ে যাও।’ (সূরা আনআম: ১১৯)।

মৃত জীব, রক্ত, শুকরের গোশত এবং গাইরুল্লাহ নামে জবাইকৃত পশু হারাম হওয়া সত্বেও তীব্র প্রয়োজনের সময় তা ভক্ষণ করার অনুমতি প্রদান করে ইরশাদ হচ্ছে, ‘তিনি তোমাদের ওপর হারাম করেছেন, মৃত জীব, রক্ত, শুকর মাংস এবং সেসব জীব-জন্তু যা আল্লাহ ব্যাতীত অপর কারো নামে উৎসর্গ করা হয়। অবশ্য যে লোক অনন্যোপায় হয়ে পড়ে এবং নাফরমানী ও সীমালঙ্ঘনকারী না হয়, তার জন্য কোনো পাপ নেই। নি:সন্দেহে আল্লাহ মহান ক্ষমাশীল, অত্যন্ত দয়ালু।’ (সূরা বাকারা-১৭৩)।

উপরোক্ত আয়াতে পরিষ্কার হারাম বস্তুও তীব্র প্রয়োজন দেখা দিলে সাময়িক হালাল হবার কথা প্রকাশ করছে। যা আমাদের একটি মূলনীতি শিক্ষা দিচ্ছে যে, তীব্র প্রয়োজন দেখা দিলে হারাম বস্তুও সাময়িকভাবে জায়েজ হয়ে যায়।

এখন একদিকে হজের সামর্থ্য থাকা অবস্থায় হজ না করলে ভয়ানক শাস্তির হুমকি। অপরদিকে ছবি তোলার অপরাধের শাস্তি। যখন দুইটি বিষয় একসঙ্গে হয়ে গেল। তখন পবিত্র কোরআনে বর্ণিত মূলনীতি ‘তীব্র প্রয়োজন হারাম বস্তুকে সাময়িক হালাল করে দেয়’  হিসেবে উলামাগণ বলেন, হজের ফরজ আদায় করতে হারাম ফটো তোলা সাময়িক বৈধতা পাবে।

(৪) মৃত ব্যক্তির নামে হজ করা যাবে?

প্রশ্ন: কেউ যদি মৃতের হজ আদায় করতে চায় তাহলে তার করণীয় কী?

উত্তর: আপনি তার পক্ষ থেকে বদলী হজ আদায় করতে পারেন। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। এক জুহাইনা এলাকার এক মহিলা রাসূল (সা.) এর কাছে এসে বললেন, আমার আম্মা হজ করার মান্নত করেছিলেন, কিন্তু হজ করার আগেই তিনি ইন্তেকাল করেছেন। আমি কী এখন তার পক্ষ থেকে তা আদায় করবো? রাসূল (সা.) ইরশাদ করলেন, হ্যাঁ, তুমি তার পক্ষ থেকে আদায় কর। তোমার মায়ের যিম্মায় যদি ঋণ থাকতো, তাহলে কী তুমি তা আদায় করতে না? তেমনি এটাও আদায় কর। কারণ আল্লাহ তায়ালাই অধিক হক রাখেন যে, তার সঙ্গে কৃত অঙ্গিকার পূর্ণ করা হবে। (বুখারী, হাদিস -১৮৫২)।

(৫) ব্যাংকে রাখা ডিপিএসের টাকায় হজ করার হুকুম কী?

প্রশ্ন: কেউ যদি ইসলামি ব্যাংকে একটি ডিপিএস করে এবং সেই টাকায় হজ করতে পারব কী না?

উত্তর: বাংলাদেশি ইসলামি ব্যাংকগুলোর ব্যবসায়িক কার্যক্রম পুরোপুরি শরীয়ত সম্মত নয়। তাই ডিপিএস থেকে প্রাপ্ত মুনাফা দিয়ে হজ করা জায়েজ হবে না। কারণ তা সুদি টাকার হুকুমে। তবে ডিপিএস বাবদ ব্যাংকে যে মূলধন জমানো হয়েছে। সেই মূল টাকা দিয়ে হজ করাতে কোনো সমস্যা নেই।

হজরত আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যখন কোনো ব্যক্তি হালাল সম্পদ নিয়ে হজ করতে বের হয়। বাহনে পা রাখে। উচ্চারণ করে, লাব্বাইক! আল্লাহুম্মা লাব্বাইক! তখন আসমান থেকে ঘোষক ঘোষণা দেয়, লাব্বাইক ওয়া সা’দাইক তথা তোমার কল্যাণ হোক। তোমার আসবাব হালাল। তোমার বাহন হালাল। আর তোমার হজ মকবুল।

আর যদি হারাম সম্পদ নিয়ে হজে বের হয়। বাহনে পা রাখে। আর মুখে বলে, লাব্বাইক! তখন আসমান থেকে একজন ঘোষক ঘোষণা দেয়, লা লাব্বাইক ওয়া লা সা’দাইক তথা তোমার লাব্বাইক মকবুল নয়। তোমার আসবাব হারাম। তোমার ভরণপোষণের ব্যয় হারাম। তোমার হজও মকবুল নয়। (মু’জামে আওসাত, হাদিস- ৫২২৮)।

(৬) হজ সংক্রান্ত ব্যবসার জন্য সুদভিত্তিক ঋণ গ্রহণ!

প্রশ্ন: কেউ একজন ট্রাভেলস এজেন্সিতে কাজ করে। তার কোম্পানি হজ সংক্রান্ত কাজের জন্য হাজীদের টাকা যথা সময়ে হাতে না পাওয়ার কারণে ব্যাংক থেকে সুদের ওপর অনেক টাকা লোন নেয়। এখন প্রশ্ন হলো, ব্যাংক থেকে সুদের ওপর হজের জন্য টাকা নেয়া জায়েয হবে কী না? আর উক্ত এজেন্সিতে কাজ করা শরীয়ত সম্মত হবে কী না?

উত্তর: সুদ দেয়া নেয়া এবং সহযোগিতা করা সবই হারাম। হজরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) এর পিতা থেকে বর্ণিত। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে সুদ খায়, যে সুদ খাওয়ায়, তার সাক্ষী যে হয়, আর দলিল যে লিখে তাদের সকলেরই ওপর আল্লাহ তায়ালা অভিশাপ করেছেন।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস -৩৮০৯, মুসনাদে আবি ইয়ালা, হাদিস- ৪৯৮১)।

আর হজের মতো একটি মহান ইবাদতের জন্য সুদ ভিত্তিক ঋণ নেয়া তো আরো জঘন্য বিষয়। তাই এ থেকে কর্তৃপক্ষকে বিরত থাকা জরুরি।

প্রতিষ্ঠানের মূলধন যদি অধিক হয়। আর ঋণের পরিমাণ কম হয়, প্রতিষ্ঠানের মূল কর্ম যদি হারাম কাজ না হয়, আর আপনি যে ডিপার্টমেন্টে চাকরি করছেন, সেই কর্মটি যদি হারামের সঙ্গে সম্পৃক্ত না হয়, তাহলে শুধু কতিপয় সুদ ভিত্তিক ঋণ নেবার কারণে উক্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরি হারাম হবে না। (ফাতাওয়া উসমানী-৩/৩৯৫)।

সেই হিসেবে ট্রাভেল এজেন্সির মূল কাজ এবং তাদের অধিকাংশ টাকা যেহেতু হজযাত্রী গ্রাহকদের কাছ থেকেই গ্রহণ করা হয়। তাই এসব প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা হারাম হবে না। তবে শর্ত হলো, চাকুরীজীবী উক্ত সুদি টাকা ব্যাংক উঠানো, গ্রহণ ইত্যাদির জিম্মাদারীর দায়িত্বরত না হতে হবে।

(৭) বদলি হজে ‘দমে শোকর’ কার নামে করতে হবে?

প্রশ্ন: কেউ যদি পিতার পক্ষ থেকে বদলি তামাত্তু হজ করার নিয়ত করে। অথচ নিজেও নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক। তাহলে প্রশ্ন হলো, বদলি হজের ‘দমে শোকর’ কার নামে আদায় করবে?

উত্তর: হজে তামাত্তুকারীর জন্য দমে শোকর হিসেবে কোরবানি করতে হয়। এটি হজের আবশ্যকীয় কোরবানি। এছাড়া ব্যক্তির কাছে যদি নিসাব পরিমাণ মাল থাকে, তাহলে তার ওপর আলাদাভাবে ঈদুল আজহার কোরবানি করা আবশ্যক হবে। যার জন্য করা হচ্ছে, দমে শোকরের কোরবানি তার নামেই হবে।

(৮) অন্ধ ব্যক্তির ওপর হজ করা ফরজ নয়?

প্রশ্ন: সামর্থ্যবান হলেও কী অন্ধ ব্যক্তির ওপর হজ ফরজ নয়?

উত্তর: যদি কোনো ব্যক্তি অন্ধ থাকা অবস্থায় হজ করার মতো অর্থ সম্পদের মালিক হয়, তাহলে তার ওপর হজ ফরজ নয়। কারণ হজ করার জন্য পূর্ণ সুস্থ্যতা আবশ্যক। আর অন্ধত্ব সেই সুস্থতার পথে প্রতিবন্ধক। তাই তার ওপর হজ করা ফরজ নয়।

কিন্তু যদি চোখে দেখতে পাবার সময় হজ ফরজ হয়, কিন্তু অলসতা করে হজ করেনি। তারপর অন্ধ হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে সে হজ করার সকল শর্ত রয়েছে। তাহলে উক্ত ব্যক্তি যদি নিজে না পারে, তাহলে অন্যকে দিয়ে বদলি হজ করিয়ে নিবে। ‘আর এ ঘরের হজ করা হলো মানুষের ওপর আল্লাহর প্রাপ্য; যে লোকের সামর্থ রয়েছে এ পর্যন্ত পৌঁছার।’ (সূরা আলে ইমরান-৯৭)।

Sharing is caring!

শেয়ার করুনঃ
shares