শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০ || ১১ আশ্বিন, ১৪২৭ || ৯ই সফর, ১৪৪২ হিজরি

হাশরের ময়দানের ভয়াবহতা ও বিচার ব্যবস্থা


পৃথিবী মানবজাতির ‘পরীক্ষার হল’। পরীক্ষার খাতায় যেমন যা ইচ্ছা লেখা যায় ঠিক তেমনি  পৃথিবীতেও মানুষ যা ইচ্ছা করতে পারে। আল্লাহ এ ক্ষমতা সবাইকে দিয়েছেন। কেউ ইচ্ছে করলে সৃষ্টিকর্তার হুকুম পালন করবে, ইচ্ছে করলে করবে না। তবে সব পরীক্ষারই একটা ফলাফল থাকে। দুনিয়া নামক পরীক্ষারও ফলাফল থাকবে।

 

গোলাম মালিকের কাজ করলে মালিক তাকে পুরস্কার দেন, কাজ না করলে দেন শাস্তি। আল্লাাহও তার বান্দাদের পুরস্কার এবং শাস্তি দিবেন। দুনিয়াতে তার হুকুম-আহকাম পালন করলে পুরস্কার স্বরূপ জান্নাত দিবেন। না করলে শাস্তি হিসেবে জাহান্নাম দিবেন। আর সেই পুরস্কার এবং শাস্তি নির্ধারণের জন্য একটি আদালত কায়েম করা হবে। সেদিন মানুষের আমলের সুষ্ঠু বিচার করা হবে। প্রত্যেককে নিজেদের কৃতকর্মের পুরস্কার ও শাস্তি দেয়া হবে। সেই বিচারিক আদালতকে বলা হয় ‘হাশরের ময়দান’। যার একমাত্র এবং চূড়ান্ত বিচারপতি ও অধিপতি হবেন মহান আল্লাহ।

হাশরের ময়দানের প্রেক্ষাপট : মহানবী (সা.) বলতেন, “কিভাবে আমি আনন্দ উল্লাস করবো, অথচ ই¯্রাফিল (আ.) মুখে শিঙ্গা লাগিয়ে শির অবনত করে গভীর মনোযোগে কান পেতে অপেক্ষা করছেন – কখন শিঙ্গায় ফুক দানের হুকুম আসে।” হযরত মুকাতিল (রহঃ) বলেন, শিঙ্গাটা শিং এর মত। শিঙ্গার গোলাকার মুখটি সাত আসমান ও যমীনের সমান। তিনি অপলক নেত্রে আরশের দিকে তাকিয়ে প্রতীক্ষা করছেন যে, কখন আদেশ করা হয়। প্রথমবার যখন শিঙ্গায় ফুক দিবেন, তখন আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত বাসিন্দারা বেহুঁশ হয়ে মারা যাবে শুধু কয়েকজন ব্যতিত। তারা হলো-জীব্রাঈল, মীকাঈল, ই¯্রাফিল ও মৃত্যুর ফেরেশ্তা আজরাঈল (আ.)। অতঃপর আল্লাহ মৃত্যুর ফেরেশ্তাকে তাদের জান কবয করার হুকুম দিবেন। তারপর আল্লাহর হুকুমে মৃত্যুর ফেরেশ্তার মৃত্যু হবে। তারপর চল্লিশ বছর যাবত  আল্লাহর কুদরতে সমস্ত রুহ আলমে বরযখে থাকবে। তারপর আল্লাহর হুকুমে ই¯্রাফিল (আ.) জীবিত হবেন ও দ্বিতীয়বার ফুক দিলে সবাই জীবিত হয়ে হাশরের মাঠে একত্রিত হবে। এ কথাই আল্লাহ পাক কুরআনে বলেছেন, অতঃপর দ্বিতীয়বার শিঙ্গায় ফুক দেওয়া হবে। তৎক্ষণাৎ তারা (জীবিত) হয়ে দাড়িয়ে (পুনরুত্থানের ভয়ংকর দৃশ্য) অবলোকন করতে থাকবে। (যুমার -৬৮) মানুষ অস্থির হয়ে দিগি¦দিক ছোটাছুটি করবে। সেদিন কারও পরনে কোনো বস্ত্র থাকবে না। কেউ কারও দিকে তাকাবেও না।

হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনÑ ‘মহানবী সা. কে বলতে শুনেছি যে, কিয়ামতের দিন মানুষকে উলঙ্গ দেহে ও খাতনাহীন অবস্থায় কবর থেকে হাশরের ময়দানে জমায়েত করা হবে। একথা শুনে আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! নারী পুরুষ সকলেই কি উলঙ্গ হবে? তারা কি একে অপরের প্রতি তাকাবে? (এরূপ হলে তো খুবই লজ্জার বিষয়)। উত্তরে তিনি বললেন, হে আয়েশা! কিয়ামতের দিনটি এত কঠিন ও বিপদময় হবে যে, মানুষের মনে একে অপরের প্রতি তাকাবারও খেয়াল হবে না।’ (বুখারি-মুসলিম)

হাশরের ময়দান কোথায় হবে? শামে হাশরের ময়দান হবে মর্মে ছহীহ হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। আর তৎকালীন শাম বর্তমানে সিরিয়া, জর্দান, লেবানন, ফিলিস্তিন ও ইসরাঈলের পুরো ভূখন্ড এবং ইরাক, তুরস্ক, মিসর ও সঊদী আরবের কিছু অংশকে শামিল করে (উইকিপিডিয়া)। আবু যর গিফারী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূল স.  বলেন, ‘শাম হ’ল একত্রিত হওয়ার ও পুনরুত্থিত হওয়ার স্থান’ (সহীহুল জামে‘ হা/৩৭২৬)। অন্য বর্ণনায় তিনি হাশরের স্থান হিসাবে শামের দিকে ইশারা করেছেন (আহমাদ হা/২০০৪৩, সহীহুল জামে‘ হা/২৩০২)। মনে রাখতে হবে যে, ক্বিয়ামতের দিন বর্তমান পৃথিবী পরিবর্তিত হয়ে অন্য পৃথিবীতে পরিণত হবে (ইবরাহীম ৪৮) এবং পাহাড়-পর্বত সব একাকার হয়ে সমতল হয়ে যাবে (ত্বোয়াহা ২০/১০৬)। যেটা মানুষের কল্পনার বাইরে।

ভয়াবহ হাশরের ময়দানের চিত্র : হাশরের মাঠের চিত্র হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। সেদিন পৃথিবী সৃষ্টি থেকে শুরু করে ধ্বংস হওয়ার পর্যন্ত সমস্ত মানুষকে জমায়েত করা হবে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছেÑ ‘সেদিন পরিবর্তিত করা হবে এ পৃথিবীকে অন্য পৃথিবীতে এবং পরিবর্তিত করা হবে আসমান সমূহকে এবং লোকেরা পরাক্রমশালী এক আল্লাহর সামনে হাজির হবে। (সুরা ইবরাহিম : ৪৮)। রাসুল সা. বলেনÑ ‘কিয়ামতের দিন সাদা ময়দার রুটির মতো চকচকে একটি মাঠের উপর সমস্ত মানুষকে একত্রিত করা হবে। সেখানে কারও কোনো নিশানা থাকবে না। (বুখারি : কিতাবুত রিকাক)

হাশরের ময়দানে আপনজনদের ভুলে যাবে : হাশরের ময়দানে মানুষ তার আপনজনদের ভুলে যাবে। সবাই নিজের চিন্তায় ব্যতিব্যস্ত থাকবে। হজরত রাসুল সা. বললেনÑ ‘তিনটি স্থানে কেউ কারও কথা স্মরণ রাখবে না। ১. মিযানের নিকট। সেখানে প্রত্যেকেই চরম উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাইবে যে, তার নেকির পাল্লা হালকা হয়, নাকি ভারী হয়! ২. আমলনামা প্রদানের সময়, যখন প্রত্যেককে বলা হবেÑ ‘তোমাদের নিজ নিজ আমলনামা পাঠ কর।’ তখন প্রত্যেকেই ভীষণভাবে অধীর হয়ে জানতে চাইবে যে, তার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে নাকি পেছন দিক দিয়ে বাম হাতে দেওয়া হবে। ৩. পুলসিরাতের নিকট, যখন তা জাহান্নামের উভয় পাড় ঘেঁষে ওপরে বসানো হবে (এবং তার ওপর দিয়ে অতিক্রমের নির্দেশ দেয়া হবে)। এই তিনটি স্থানে কেউ কাউকে স্মরণ রাখবে না।’ (আবু দাউদ)

কাফেররা অন্ধ ও চেহারার উপর ভর করে  হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবে : আল্লাহ তাআলা বলেন: আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জন্য হবে নিশ্চয় এক সংকুচিত জীবন এবং আমি তাকে কিয়ামত দিবসে উঠাবো অন্ধ অবস্থায়। সে বলবে, হে আমার রব, কেন আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালেন? অথচ আমি তো ছিলাম দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন? তিনি বলবেন, এমনিভাবেই তোমার নিকট আমার নিদর্শনাবলী এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে এবং সেভাবেই আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হল। (সূরা ত্বা-হা- ১২৪-১২৬)

তিনি আরো বলেন: আর আমি কিয়ামতের দিনে তাদেরকে একত্র করব উপুড় করে, অন্ধ, মূক ও বধির অবস্থায়। তাদের আশ্রয়স্থল জাহান্নাম; যখনই তা নিস্তেজ হবে তখনই আমি তাদের জন্য আগুন বাড়িয়ে দেব। (সূরা বানী ইসরাইল- ৯৭)

হাদীসে এসেছে: আনাস রা. থেকে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কিয়ামতের দিন কাফেরদের কিভাবে চেহারার উপর উপুর করে উঠানো হবে? তিনি বললেন: যে মহান সত্ত্বা দুনিয়াতে দু পা দিয়ে চলাচল করিয়েছেন, তিনি কি কিয়ামতের দিন মুখ-মন্ডল দিয়ে চলাচল করাতে পারবেন না? কাতাদা বললেন : অবশ্যই তিনি পারবেন, মহান রবের সম্মানের কসম করে বলছি। (বুখারী ও মুসলিম)

আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত যে রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন: কেয়ামতের দিন মানুষ ঘর্মক্ত হবে। এমনকি যমীনের সত্তর হাত ঘামে ডুবে যাবে। তাদের ঘামে তারা কান পর্যন্ত ডুবে যাবে। (বুখারী ও মুসলিম)

হাশরের ময়দানে  সূর্যের দূরত্ব ও প্রখরতা : মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি রাসূলুল্লাহ স. কে বলতে শুনেছি তিনি বলেছেন: কিয়ামত দিবসে সূর্য মানুষের খুব নিকটবর্তী হবে। এমনকি এর দুরত্ব এক মাইল পরিমাণ হবে। এ সম্পর্কে সুলাইম ইবনে আমের বলেন, আল্লাহর শপথ! মাইল বলতে এখানে কোন মাইল তিনি বুঝিয়েছেন আমি তা জানি না। জমির দূরত্ব পরিমাপের মাইল বুঝিয়েছেন, না সুরমা দানির মাইল (শলাকা) বুঝিয়েছেন? মানুষ তার আমল অনুযায়ী ঘামের মধ্যে থাকবে। কারো ঘাম হবে পায়ের গিরা বরাবর। কারো ঘামের পরিমাণ হবে হাটু বরাবর। কারো ঘামের পরিমাণ হবে কোমর বরাবর। আবার কারো ঘামের পরিমাণ হবে তার মুখ বরাবর। (সহীহ মুসলিম ২১৯৬)

হযরত উকবা ইবনে আমের (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, কিয়ামত দিবসে সূর্য্য যমীনের নিকটবর্তী হবে; ফলে মানুষ ঘর্মাক্ত হতে থাকবে। কারো ঘাম গোড়ালী পর্যন্ত, কারো অর্ধহাঁটু, কারো উরু, কারো কোমর, কারো মুখ পর্যন্ত পৌঁছবে। কারো মাথা পর্যন্ত ঘামের মধ্যে ডুবে যাবে।

হযরত ইবনে উমর (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যেদিন মানুষ রাব্বূল আলামিনের সম্মুখে হিসাবের জন্য দন্ডায়মান হবে, সেদিন অনেকেই নিজের ঘামে কান পর্যন্ত ডুবে যাবে। আর এক হাদিসে এসেছে, মানুষ দন্ডায়মান অবস্থায় চল্লিশ বছর পর্যন্ত আসমানের দিকে তাকিয়ে থাকবে এবং সীমাহীন কষ্টের দরুণ ঘাম ঝরে ঝরে গলা পর্যন্ত পৌঁছবে।

আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ স. বলেন : কিয়ামতের দিন মানুষের এত ঘাম বেরুবে যে, তা জমিনে সত্তর গজ উঁচু হয়ে বইতে থাকবে এবং তাদের ঘামের লাগাম পরানো হবে, এমনকি তা তাদের কান পর্যন্ত পৌঁছে যাবে।

হাশরের ময়দানে হাউজে কাওসারের পানি পান : হযরত সাহাল বিন সাদ রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, আমি তোমাদের আগে হাউজে কাউসারের ধারে পৌঁছবো। যে আমার নিকট দিয়ে অতিক্রম করবে, সে হাউযের পানি পান করবে। আর যে পান করবে সে আর কখনোও পিপাসার্ত হবে না। নিঃসন্দেহে কিছু সম্প্রদায় আমার সামনে (হাউজে) উপস্থিত হবে। আমি তাদেরকে চিনতে পারবো আর তারাও আমাকে চিনতে পারবে। এরপর আমার এবং তাদের মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে দেয়া হবে। (সহীহ বুখারী-৬৫৮৩)

আরশের ছায়ায় স্থান পাবে সাতজন : হাশরের ময়দানের অবস্থা এতটাই ভয়াবহ হবে যে, সূর্য মানুষের মাথার মাত্র অর্ধ হাত উপরে আসবে। আর পায়ের নিচের মাটি হবে জ্বলন্ত তামার। তাই গরমের তীব্রতায় মানুষের মাথার মগজ টগবগ করবে। যেমন চুলার উপর ভাতের পাতিল টগবগ করে। এই কঠিন এবং ভয়াবহ অবস্থায় মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় সাত প্রকারের বান্দাকে নিজের আরশের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন। জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডের মাঝে তাদের জন্য রহমতের শীতল চাদর বিছিয়ে দেবেন। দাউদাউ করা দাবানলের গ্রাস থেকে প্রিয় বান্দাদের রক্ষা করবেন। আসুন জেনে নিই সেই সৌভাগ্যবান সাত ব্যক্তি কারা।

আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন: আল্লাহ তাআলা কেয়ামতের দিন বলবেন, যারা পরস্পরকে ভালোবেসেছে আমারই জন্য তারা আজ কোথায়? আজ আমি তাদেরকে আমার ছায়ায় ছায়া দান করবো। আজ এমন দিন আমার ছায়া ব্যতীত আর কোন ছায়া নেই। (সহীহ মুসলিম ১৯৮৮)

আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল স. বলেছেন: কেয়ামত দিবসে সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা তার আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দিবেন, যেদিন তার ছায়া ব্যতীত ভিন্ন কোন ছায়া থাকবে না- ন্যায়পরায়ণ বাদশা; এমন যুবক যে তার যৌবন ব্যয় করেছে আল্লাহর ইবাদতে; ঐ ব্যক্তি যার হৃদয় সর্বদা সংশ্লিষ্ট থাকে মসজিদের সাথে; এমন দু ব্যক্তি, যারা আল্লাহর জন্য একে অপরকে ভালোবেসেছে, এবং বিচ্ছিন্ন হয়েছে তারই জন্য; এমন ব্যক্তি, যাকে কোন সুন্দরী নেতৃস্থানীয়া এক রমণী আহ্বান করল অশ্লীল কর্মের  প্রতি, কিন্তু প্রত্যাখ্যান করে সে বলল, আমি আল্লাহকে ভয় করি; এমন ব্যক্তি, যে এরূপ গোপনে দান করে যে, তার বাম হাত ডান হাতের দান সম্পর্কে অবগত হয় না। আর এমন ব্যক্তি, নির্জনে যে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার দু-চোখ বেয়ে বয়ে যায় অশ্রুধারা। (বুখারী ও মুসলিম)

আবু ইয়াসার কাআব ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন: যে কোন ঋণগ্রস্ত বা অভাবী ব্যক্তিকে সুযোগ দেবে অথবা তাকে ঋণ আদায় থেকে অব্যাহতি দেবে আল্লাহ তাআলা তাকে নিজ ছায়ায় আশ্রয় দিবেন। (মুসলিম- ১০৩)

সুপারিশের জন্য আকুতি : ভয়াবহ এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে অস্থির হয়ে উঠবে লোকজন। তাদের দাবি হবেÑ বিচারের রায় যাই হোক না কেন, বিচারটা আগে হয়ে যাক। সেজন্য তারা নবীদের কাছে যাবে; যেন তারা আল্লাহর কাছে বিচার শুরু হওয়ার জন্য সুপারিশ করেন। এ বিষয়ে হজরত আমাস সা. থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুল সা. বলেন, ‘যখন কেয়ামত হবে তখন মানুষ জনসমুদ্রের ভিড়ের মধ্যে হুমড়ি খেতে থাকবে। তারা তখন হজরত আদম আ. এর কাছে আরজ করবেÑ আপনি আমাদের জন্য আল্লাহ পাকের কাছে সুপারিশ করুন। তিনি বলবেন, আমি তার উপযুক্ত নই বরং তোমরা আল্লাহর খলিল হজরত ইবরাহিম আ. এর কাছে যাও, কেননা তিনি আল্লাহ পাকের অন্তরঙ্গ বন্ধু। তারা ইবরাহিম আ. এর কাছে হাজির হয়ে এরূপ আরজ করলে তিনিও বলবেন, আমি তার উপযুক্ত নই। তোমরা ঈসা আ. এর কাছে যাও। যিনি হলেন রুহুল্লাহ। অতঃপর তারা হজরত ঈসা আ. এর কাছে গিয়ে ওই কথা বলবে। তিনি বলবেন, আমি এ কাজের লায়েক নই। তোমরা বরং মুহাম্মদ সা. এর খেদমতে যাও। তখন তারা আমার কাছে আসবে এবং আমি বলব, হ্যাঁ, আমি এ জন্য আছি। অতঃপর আমি আল্লাহ পাকের কাছে অনুমতি চাইলে আমাকে অনুমতি দেবেন এবং কতগুলো প্রশংসাবাণী আমার অন্তরে ঢেলে দেবেন, যেগুলোর দ্বারা আমি প্রশংসা করব কিন্তু সেগুলো এখন আমার কলবে অনুপস্থিত। অতঃপর আল্লাহপাকের সন্তুষ্টির জন্য সিজদা করব। তখন বলা হবে, হে মুহাম্মদ আপনি মাথা উঠান এবং যা খুশি বলুন, আজ আপনার কথা শোনা হবে। আমি তখন সকল মানুষের হিসাব-নিকাশ শুরুর জন্য সুপারিশ করবো। (বুখারি শরিফ)

হাশরের ময়দানে সবাইকে আমলনামা প্রদান : বিচার শুরু হওয়ার পর আল্লাহ তায়ালা সবার হাতে তাদের দুনিয়ার আমলনামা দিবেন। আমলনামা দেয়ার সময় সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত থাকবে। কারণ, আল্লাহ কারও আমলনামা ডান হাতে দিবেন। কারও দিবেন পিছন দিকে ঘুরিয়ে বাম হাতে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

যাকে তার আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে, তার হিসাব-নিকাশ সহজে হয়ে যাবে   এবং সে তার পরিবার-পরিজনের কাছে হৃষ্টচিত্তে ফিরে যাবে এবং যাকে তার আমলনামা পিঠের পশ্চাৎদিক থেকে দেয়া, হবে, সে মৃত্যুকে আহবান করবে। (সূরা ইনশিকাক-৭-১১)

এ আমলনামায় তার দুনিয়ার প্রতিটি কর্মের কথা অক্ষরে অক্ষরে লেখা থাকবে। দুনিয়াতে প্রতিটি মানুুষের সাথে আল্লাহ দু’জন ফেরেশতা রেখেছেন। একজন তার ডান কাঁধে থেকে তার নেক আমলগুলো লিখে রেখেছে। অন্যজন বাম কাঁধে থেকে তার বদ আমলগুলো লিখে রেখেছেন। হাশরের দিন প্রত্যেকের হাতে সে আমলনামা দেয়া হবে। এবিষয়ে কুরআনে বলা হয়েছেÑ ‘(আমলনামা দিয়ে আল্লাহ বলবেন) তুমি তোমার আমলনামা পড়। তুমি নিজেই আমলনামা পড়ে তোমার রায় লিখÑতোমার কী বিচার হওয়া উচিত।’ (সুরা বনী ইসরাঈল : ১৪) সে আমলনামা দেখার পর অনেকের দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যাবে যে, তার আমলনামায় নেকআমল বেশি, নাকি বদআমল বেশি! তখন আল্লাহ তাদের সন্দেহ দূর করার জন্য মিযান তথা পাল্লার ব্যবস্থা করবেন। তাতে মেপে দেখাবেন কার আমলনামা কোন দিকে ভারী।

অতএব যার পাল্লা ভারী হবে, সে সুখীজীবন যাপন করবে।  আর যার পাল্লা হালকা হবে, তার ঠিকানা হবে হাবিয়া। আপনি জানেন তা কি? প্রজ্জ্বলিত অগ্নি! (সূরা কারিয়া-৬-১১)

হাশরের ময়দানে জিহ্বা ও হাত-পা’র সাক্ষ্য : নিজের হাতে আমলনামা দেখে এবং পাল্লা দিয়ে ওজন করার পরও অনেকে কৃতকর্ম অস্বীকার করে বসবে। তারা বলতে চাইবেÑ আমরা এই এই কাজ করিনি। ফেরশতাগণ কমবেশি বা ভুল করে লিখে রেখেছেন। তখন আল্লাহ তায়ালা তাদের মুখ বন্ধ করে দিবেন। তাদের ইচ্ছাধীন বাকশক্তির বদলে তাদের জিহ্বা, হাত এবং পা’কে কথা বলার শক্তি দিবেন। তখন জিহ্বা তার কৃতকর্মের সাক্ষ্য দিয়ে বলবে, হে আল্লাহ! সে আমার দ্বারা অমুককে গালি দিয়েছে, এই এই মিথ্যা বলেছে। এমনিভাবে হাত সাক্ষ্য দিবেÑ সে আমার দ্বারা অন্যায়ভাবে অমুকে প্রহার করেছে, আমার দ্বারা এই খারাপ কাজ করেছে। পা সাক্ষ্য দিবেÑ এ আমার দ্বারা এই এই খারাপ কাজ করেছে। পবিত্র কুরআনে আছেÑ ‘সেদিন প্রকাশ করে দিবে তাদের জিহ্বা, তাদের হাত ও তাদের পা, যা তারা করত।’ (সুরা নুর : ২৪) এমনিভাবে জমিনও তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে। আল্লাহ তায়ালা বলেনÑ ‘সেদিন মাটি প্রত্যেকের সম্পর্কে বলে দিবেÑ হে পরওয়ারদেগার! তোমার বান্দা আমার উপরে থেকে নাফরমানী করেছে। আমাকে পায়ের নিচে থাকার জন্য বলে দিয়েছেন, তাই পায়ের নিচে ছিলাম ঠিক; কিন্তু সে আমার উপরে থেকে অবাধ্যতা করেছে।’ (সুরা যিলযাল)

হাশরের ময়দানে বিচারের পদ্ধতি : কেয়ামতের দিন যাদের হিসাব নেয়া হবে তারা মূলত দুই শ্রেণীতে বিভক্ত হবে। এক শ্রেণী হলো, যাদের হিসাব খুব সহজ হবে। সেটি শুধু আমলনামা প্রদর্শন করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মোমিনদের জননী হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কেয়ামতের দিন যারই হিসাব নেয়া হবে সে ধ্বংস হয়ে যাবে। আমি জানতে চাইলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আল্লাহ তায়ালা কি বলেননি, যার আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে তার হিসাব সহজ করে নেয়া হবে! রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, এটি হচ্ছে শুধু প্রদর্শনের ক্ষেত্রে। আর কেয়ামতের দিন যার হিসাব জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে নেয়া হবে, তাকে অবশ্যই শাস্তি দেয়া হবে।’ (বোখারি : ৬৫৩৭, মুসলিম : ২৮৭৬)।

অপর শ্রেণী হলো, যাদের হিসাব খুব কঠিন করে নেয়া হবে। ছোটবড় প্রত্যেক বিষয়েই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। যদি সত্যি বলে তাহলে খুবই ভালো। আর যদি মিথ্যা বলে অথবা গোপন করার চেষ্টা করে তাহলে তাদের মুখে সিলমোহর এঁটে দেয়া হবে, তখন তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কথা বলতে থাকবে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আজ আমি তাদের মুখে মোহর এঁটে দেব, তাদের হাত আমার সঙ্গে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে।’ (সূরা ইয়াসিন : ৬৫)।

হাশরের ময়দানে পাঁচটি প্রশ্নের জওয়াব : হাশরের ময়দানে ৫টি সুওয়ালের জাওয়াব না দেয়া পর্যন্ত কেউই তার ক্বদম নড়াতে পারবে না। রাসূল স. এরশাদ করেন, হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার কোনো সন্তান অর্থাৎ কোনো মানুষ হাশরের ময়দানে তার ক্বদম নড়াতে পারবে না ৫টি প্রশ্নের বা সুওয়ালের জাওয়াব না দেয়া পর্যন্ত। (এক) তার হায়াতে জিন্দেগী কিভাবে সে অতিবাহিত করেছে। (দুই) তার যৌবনকাল কিভাবে সে কাটিয়েছে। (তিন) তার অর্থ-সম্পদ কিভাবে সে উপার্জন ও অর্জন করেছে। (চার) তার উপার্জিত ও অর্জিত অর্থ-সম্পদ কোন পথে সে ব্যয় করেছে। (পাঁচ) সে যে ইলম অর্জন করেছে তাদনুযায়ী সে কি আমল করেছে। এই পাঁচটি সুওয়ালের জাওয়াব না দেয়া পর্যন্ত সে তার ক্বদম নড়াতে পারবে না। কাজেই, পুরুষ-মহিলা প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার ইন্তিকালের পূর্বে হায়াতের মধ্যেই উক্ত সুওয়ালের জাওয়াব সমূহ ঠিক করে নিতে হবে। অন্যথায় কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে।

কুরআন ভুলে যাওয়ার জন্যে হাশরের ময়দানে কঠোর শাস্তি : যে কুরআন শরিফ ভুলে গেছে তার কঠিন অবস্থা হবে। হযরত সাদ ইবনে ওবাদা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কুরআন শরিফ পড়েছে, অতঃপর (অলসতা অমনোযোগিতার কারণে) ভুলে গেছে, সে কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে। (মেশকাত শরিফ)

এক হাদিসে বর্ণিত রয়েছে, হুযূর সা. ইরশাদ করেন, আমার সামনে উম্মতের গোনাহসমূহ পেশ করা হয়েছে আমি তার মধ্যে এর চেয়ে বড় আর কোন গুনাহ দেখিনি যে, কেউ কুরআন শরিফের কোন সূরা অথবা আয়াত মুখস্থ করেছে অতঃপর তা ভুলে গেছে। (তিরমিযি শরিফ) পক্ষান্তরে  সেদিন কুরআন তেলাওয়াতকারীও আল্লাহ তায়ালার নিকটে মর্যাদাবান হবে। ভয়ভীতির এ মুহূর্তেও এক শ্রেণীর লোকের চেহারা হবে প্রফুল্ল, পুর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল, তারা আরশের নীচে রহমতের শীতল ছায়ায় সম্মানিত আসনে সমাসীন হবে। তারা কারা? তারা ঐ সব লোক যারা লাঞ্ছনা-বঞ্চনা, উপহাস সহ্য করে বস্তু জগতে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করেছে। পবিত্র কুরআনকে বুকে ধারন করেছে। হাশরের ময়দানে পবিত্র কুরআন তাদের জন্য সুপারিশ করবে, পুলসিরাতে তাদের জন্য সহায়ক হবে। যাদের এ বিশ্বাস আছে, তারা যেমন বস্তু জগতে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের স্বাদ লাভ করেছে তেমন আখেরাতেও লাভ করবে এবং তাদের সম্মানার্থে স্বয়ং আল্লাহপাক পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করে শুনাবেন। তখন তারা সেখানে অপূর্ব স্বাদ উপভোগ করবে। এ বিশ্বাসে যে দৃঢ় ও অটল তার জন্য বস্তু জগতে তেলাওয়াত করা এবং কুরআনকে বুকে ধারণ করা মোটেই কঠিন ব্যাপার নয়, বরং অতি সহজসাধ্য ব্যাপার।

হাশরের ময়দানে হত্যাকারী এবং নিহত ব্যক্তির অবস্থা : হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, কেয়ামতের দিন নিহত ব্যক্তি তার হত্যাকারীকে এমনভাবে ধরে আনবে, যখন হত্যাকারীর কপাল এবং মাথা নিহতের হাতের মুঠোয় থাকবে। আর নিহতের ঘাড়ের রগ থেকে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকবে। সে আল্লাহর দরবারে আরজ করবে, হে রব, এ ব্যক্তি আমাকে হত্যা করেছে। নিহত ব্যক্তি (এমনিভাবে) হত্যাকারীকে নিয়ে আরশের কাছে পৌঁছবে। (তিরমিযি, নাসাঈ) হত্যাকারী যেভাবে শাস্তি পাবে ঠিক তদ্রুপ হত্যায় সাহায্যকারীও শাস্তি পাবে। হযরত আবু হোরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের হত্যায় একটু কথার দ্বারাও সাহায্য করেছে, (কেয়ামতের দিন) সে আল্লাহ তাআলার সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাত করবে যে, তার উভয় চোখের মাঝখানে লেখা থাকবে  (আ’য়েসুম্ মির রাহমাতিল্লাহ) আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ। (ইবনে মাজাহ)

উপসংহার : অঙ্গ-প্রতঙ্গ ও জমিন সাক্ষ্য দেয়ার পর ওই সমস্ত লোক হতবম্ব হয়ে যাবে; যারা আল্লাহর সঙ্গে ঝগড়া করেছে বা নিজেদের আমল নিয়ে সন্দিহান ছিল। নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের ব্যর্থ হয়ে তারা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকবে। তখন আল্লাহ তায়ালা সমস্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং আমল নামার ভিত্তিতে বিচারের রায় দিবেন। সেই রায়ে কোনো খেদ থাকবে না। আপিল বা আপত্তি করার সুযোগ থাকবে না। সেদিন সর্বময়ী ক্ষমতার অধিকারী একমাত্র পরাক্রমশালী মহান আল্লাহ। পবিত্র কুরআনের সে কথাই বলা হয়েছেÑ ‘তিনি বিচার দিবসের মালিক’। (সুরা ফাতিহা : ৩)

শেয়ার করুনঃ